কবি গানের দল
লোক মারফৎ নির্দেশ চলে এল। একটি চিঠি নিয়ে এসেছে ছেলেটি। চিঠির মধ্যে জরুরী নির্দেশ, আমাকে অবিলম্বে ১ নং ঢাকেশ্বরী মিলের কবির দল নিয়ে বেরিয়ে পড়তে হবে। শুধু বেরিয়ে পড়া নয়, সেই দলের নেতৃত্বও নাকি আমাকেই করতে হবে। একবার ভেবে দেখুন ব্যাপারটা। কবি গানের সঙ্গে আমার কোনো কালেই তেমন ঘনিষ্ঠ পরিচয় ছিল না। আর বেছে বেছে সেই দলের অধিকারী মনোনীত করা হয়েছে আমাকে! অতি বড় বীরপুরুষও অনুরূপ অবস্থায় আতঙ্কিত না হয়ে পারে না-আমি তো কোনো ছার।
১৯৪৬ সালের কথা। সাধারন নির্বাচন আসন্ন। তখন কমিউনিষ্ট পার্টি নিষিদ্ধ ছিল না, অন্যান্য পার্টির মতো তারাও প্রকাশ্যে কাজ করবার অধিকারী ছিল। নারায়ণগঞ্জ মহকুমা ও ঢাকা সদর মহকুমার কতকটা অংশ নিয়ে একটা নির্বাচকমণ্ডলী গঠন করা হয়েছিল। নারায়ণগঞ্জ শহরের বিশিষ্ট জননেতা কমরেড ব্রজেন দাস সেই আসনে কমিউনিষ্ট পার্টির পক্ষ থেকে প্রার্থী হিসাবে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন একজন কংগ্রেসী। উভয় পক্ষের কর্মীরা নিজ নিজ প্রচার কার্য শুরু করে দিয়েছেন। ১নং ঢাকেশ্বরী মিলের এই কবির দলটি কমরেড ব্রজেন দাসের পক্ষে প্রচার অভিযানে যাত্রা করবে। তাদের প্রচার চলবে কবি গানের মধ্য দিয়ে। বিভিন্ন কেন্দ্রে এরা গান গেয়ে ফিরবে। আর তাদের পরিচালনার দায়িত্ব নিতে হবে আমাকে।
ভয় পেয়ে আপত্তি জানিয়েছিলাম। কিন্তু আমার সেই আপত্তি টেকে নি। চিঠিতে বলা হয়েছে, সমস্ত দিক বিবেচনা করে এই ব্যাপারে আমাকেই না কি যোগ্যতম পাত্র বলে বাছাই করা হয়েছে। ওদিকে নির্বাচনের সময় সন্নিকট। অতএব সমস্ত আপত্তি তাকে তুলে রেখে আমাকে অবিলম্বে আমার বাহিনী নিয়ে রওয়ানা দিতে হবে।
দলটি যে পেশাদার কবির দল নয়, আশা করি সে কথা বুঝতে পারছেন। আবার একমাত্র নির্বাচনের প্রচারকার্য চালাবার উদ্দেশ্য নিয়ে গঠিত একটি এড-হক কবি গানের দলও নয়। মিলের শ্রমিকরা নিজেদের উদ্যোগে এবং নিজেদের প্রয়োজন মিটাবার উদ্দেশ্য নিয়ে দলটিকে গড়ে তুলেছিল। এদের প্রধান বিশেষত্ব ছিল এই যে, এরা কখনোই সাধারণ কবি গানের দলের মতো পৌরানিক বা মামুলী বিষয় নিয়ে গান গাইত না। রাজনৈতিক ও সামাজিক, বিশেষ করে রাজনৈতিক ব্যাপার ও ঘটনাবলী ছিল এদের গানের বিষয়বস্তু। মালিক বনাম শ্রমিক, জমিদার বনাম কৃষক, জোতদার বনাম ভাগচাষী, কংগ্রেস বনাম কমিউনিষ্ট-এই ধরনের বিষয়গুলিই ছিল এদের কাছে সব চেয়ে বেশী প্রিয়।
শ্রোতাদের উৎসাহ ছিল অপরিসীম। একই ধরনের গান এবং একই ধরনের যুক্তি ও প্রতিযুক্তি ক্রমাগত শুনে শুনেও তাদের শুনার তৃষ্ণা মিটতেই চাইত না। আর যাঁরা গান করতেন তাঁরা নানা জায়গা থেকে নতুন নতুন তথ্য, ঘটনা ও ভাব সংযোগ করে তাদের গানকে সমৃদ্ধতর করে তুলতেন।
এ সম্পর্কে কোনোই সন্দেহ নাই যে, এ বিষয়ে চট্টগ্রামের স্বনাম ধন্য কবিয়াল রমেশ শীল ছিলেন তাঁদের পথ প্রদর্শক। তাঁর কাছ থেকে অনুুপ্রেরণা পেয়েই এরা এদের এই রাজনৈতিক কবি গানের দলটিকে গড়ে তুলেছিলেন। এখানকার শ্রমিকরা কত দূর সচেতন হয়ে উঠেছিল, তা এই কবি গানের দল থেকে আর এই সমস্ত গান শুনবার জন্য সাধারণ শ্রমিকদের আগ্রহ থেকে তার কিছুটা পরিচয় পাওয়া যেত।
কবিগানের দলটা ছিল ১নং ঢাকেশ্বরী মিলে, কিন্তু ২নং ঢাকেশ্বরী, লক্ষ্মীনারায়ণ, চিত্তরঞ্জন-এই গান শুনবার জন্য ভিড় জমাতেন। এটি ছিল যেন তাদের সকলেরই সম্পত্তি, সকলেরই গর্ব ও আদরের জিনিস। মিলগুলো আলাদা হতে পারে, কিন্তু শ্রমিকরা ছিলেন এক মন, এক প্রাণ। তাদের সবাইকে নিয়ে যেন একটি বৃহৎ পরিবার গড়ে উঠেছিল। এই পরিবারের জঙ্গী মানুষগুলি এক সঙ্গে উঠত বসত, এক পথ ধরে চলত, আর একের বিপদে আর সবাই এসে বুক পেতে দাঁড়াত। আন্দোলনের বেলায়ও তাই, গানের বেলায়ও তাই। বিভিন্ন মিলে হিন্দু আর মুসলমান শ্রমিক এবং বিভিন্ন
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments